দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষার জন্য আসার সময় অন্যতম একটি চিন্তাভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় কি নিয়ে আসবো বা কি কি কিনবো। আমি খুব সম্প্রতি ইউএসএ’তে এসেছি আমার উচ্চ শিক্ষার জন্য। আমি আসার পর এখন দেখি যে বেশ কিছু জিনিস যদি না আনতাম তাহলে হয়তোবা ভালো ছিলো। সে ধারণা থেকেই আমি লিস্টটা সাজিয়েছি।
বলে রাখি, এটাকে একটা স্যাম্পল ধরে আপনি আপনার প্রয়োজনমতো শপিং করে নিতে পারেন। যেহেতু সবার চাহিদা একরকম নয়, সেহেতু মানুষভেদে কমবেশি হতে পারে । আরেকটি বিষয় মাথায় রাখা উচিত যে, এটা আসলে একটা ধারণা। একবছর পর এসে আমার এখন মনে হচ্ছে যথাসম্ভব কম জিনিস আনা ভালো ছিলো। আলটিমেটলি সব কিনতেই পারা যায়।
যেসব জিনিস বাংলাদেশ থেকে নতুন করে কেনা উচিত নয়, যদি আপনি দু এক মাসের মধ্যে ইউএসএ তে ভ্রমণ করার প্ল্যান রাখেন।
- ল্যাপটপ, মোবাইলসহ ইলেকট্রনিক ডিভাইস: মোটামুটি বাংলাদেশের থেকে কমদামে ডিভাইস পাবেন ইউএসএতে। যদি আপনার কিছুদিনের মধ্যে ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকে, তাহলে দেশ থেকে এসব জিনিস কিনে না আনাই ভালো। ইউএসএতে সবচেয়ে সুবিধা হলো, যেকোনো জিনিসই মোটামুটি তিনমাসের মধ্যে ইজিলি রিটার্ন করা যায়। ধরা যাক, আপনি একটা ল্যাপটপ কিনলেন, কিছুদিন পর আরেকটি নতুন ব্র্যান্ড আপনার পছন্দ হলো বা ল্যাপটপে কোনো ত্রুটি ধরা পড়লো, তাহলে আপনি ইজিলি রিটার্ণ দিতে পারবেন। Amazon, best buy, Walmart, ebay এসব ওয়েবসাইট থেকে আপনি ইজিলি যেকোন ডিভাইস ও তাদের প্রাইস দেখতে ও কিনতে পারবেন।
দেশ থেকে ফোন কিনলে আপনার ফোনটি অনেক সময় এখানে নাও কাজ করতে পারে। সিম ভেদে এটা ভ্যারি করে। আমি প্রথমে Cricket সিম ব্যবহার করেছি, এই সিমের জন্য আমার বাংলাদেশে ব্যবহৃত ফোনটি কোনো কাজে আসেনি। পরে আমাকে ক্রিকেট অপারেটর থেকে আরেকটি ফোন কেনা লাগছিলো। এসব অপারেটরে সমস্যা হলো আপনাকে নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত তাদের সেবা নিতে হবে।
আমি পরে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ক্রিকেট থেকে Tello তে সুইচ করলে ক্রিকেট সিমে কেনা মোবাইলটি মূলত ডেড হয়ে যায়। Tello এর কলরেট তুলনামূলক অনেক কম, মাসে ১২/১৪ ডলার আসে, রেফারেল ব্যবহার করলে সেটা ১০/১২ এর মতো হয়ে যায়। কমের মধ্যে Mint ও ব্যবহার করতে পারেন। যদিও আমি আবার Tello পাল্টে এখন আবার AT&T তে সূইচ হয়ে গিয়েছি।
ইউএস তে রেফারেল বিষয়টা অনেক চলে, যেমন আপনি নিজে নিজে কেনার থেকে কারো রেফারেল নিয়ে কিনলে কিছুটা কম বা কিছু বোনাস পাওয়া যায়। অন্যদিকে যিনি আপনাকে রেফার করবেন তিনিও রেফারের কারণে কিছুটা বোনাস পাবেন। ব্যাংক, ক্রেডিট কার্ড, সিম কার্ড কেনার ক্ষেত্রে রেফারেল ব্যবহার করলে আপনি কিছুটা বোনাস পাবেন।
এই ধরুন, আপনি Discover Credit Card করলে যদি কারো রেফারেল ব্যবহার করেন তাহলে দুজনেই ১০০ ডলার করে বোনাস পাবেন। আমার রেফারেল লিংক: https://refer.discover.com/s/mahedikabir12
বা Chase Bank এ যদি একাউন্ট খুলতে চান, তাহলে রেফারেল ব্যবহার করলে ২২৫ ডলার পর্যন্ত রেফারেল বোনাস পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে যার রেফারেল ব্যবহার করবেন উনি ৫০ ডলার পাবেন। আমার রেফারেল লিংক: https://accounts.chase.com/raf/share/2954702922
দেশে টাকা পাঠানোর জন্য Remity, Western Union, Sendwave, Ria Money Transfer, Taptap Send সহ আরো বেশকিছু এপ/ওয়েবসাইট ব্যবহার করতে পারেন। বিস্তারিত নিয়ে আরেকটা পোস্ট লিখবো।
দেশ থেকে যেসব জিনিস আনতে পারেন।
এর আগে একটা বিষয় বলে রাখি, ইউএসএ যেহেতু পৃথিবীর অন্যতম উন্নত একটি দেশ, এখানে মোটামুটি সবই মেলে। দাম দু এক ডলার কম আর বেশি। আপনি যদি কোনো কিছু না এনেও চলে আসেন তাহলেও এখানে দেদারসে চলতে পারবেন। তবে প্রথমে একটু বেশি খরচ হয় বিধায় অনেকে দেশ থেকে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস/ ব্যবহার্য জিনিসপত্র আনতে পছন্দ করেন, সে সুবাধেই লিস্টটা করা।
১. ব্যাকপ্যাক: (১ টি)- একটা ব্যাকপ্যাক আনতে পারেন। এখানের শিক্ষার্থীরা সাধারণত একটু বড় ধরনের ব্যাকপ্যাক পছন্দ করেন। তবে আমার ব্যক্তিগত পছন্দ ছোট সিম্পল ব্যাকপ্যাক, যেখানে একটা ল্যাপটপ ও দুই তিনটা খাতা দেদারসে আটবে। প্রেসিডেন্ট এর ব্যাকপ্যাকগুলা বেশ ফ্লেক্সিবল মনে হয়েছে আমার।
২. লাগেজ: ( ২৮ ইঞ্চি দুইটা) এটাকে চেক ইন লাগেজ বলে। আপনি ইউএস’এ পড়তে আসলে ২৩ কেজি + ২৩ কেজির দুইটা লাগেজ নিতে পারবেন। সেই সাথে নিজের সাথে ৭ কেজির আরেকটি ব্যাগ নিতে পারবেন যেটাকে ক্যারি অন লাগেজ বলে। লাগেজও প্রেসিডেন্ট এর নিতে পারেন। আমি লোটোর একটা আনছিলাম, হাতল ভেঙে গেছে। ৩০০০ থেকে ৭/৮০০০ হাজার টাকা পড়ে এভারেজে প্রতি লাগেজের দাম।
৩. মসলা- (হলুদ, মরিচ, ধনিয়া এবং গরম মসলা) বেশ দরকারি জিনিস। যদিও ইন্ডিয়ান/ এশিয়ান শপগুলোতে বাংলাদেশের ভালো ভালো ব্রান্ডের মসলা পাবেন। তবে এখানে প্রথমে এসে মসলার দামটা বেশ চোখে পড়বে। কয়েকদিন পরে অবশ্য খুব ইজি হয়ে যায়। এই জন্য প্রথমে বাংলাদেশ থেকে আনতে পারলে ভালো। প্রতি আইটেম ১-২ কেজি করে আনতে পারেন। মুরগী/গরুর মাংসের মসলাও সাথে করে আনতে পারেন।
৪. টি শার্ট (২/৩ টা) টি শার্ট বেশি আনতে না করবো আমি। সাধারণত ইউনিভার্সিটি থেকে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন প্রোগ্রামে টি শার্ট পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে দেশ থেকে আনা টি শার্ট লাগেজেই পড়ে থাকে বেশি। তবে জায়গা থাকলে আর দু একটা আনতে পারেন।
৫. জার্সি: (২ টা) পরার অভ্যাস থাকলে আনতে পারেন। ইউএস’তে দাম অত্যধিক বেশি জার্সির।
৬. পাঞ্জাবি-পায়জামা (২/৩ টা): আনা উচিত। নামাজে যাওয়ার সময় পরা যায়। সেই সাথে বিভিন্ন প্রোগ্রামেও পরা যায়।
৭. নরমাল শার্ট (৩ টা) ইউনিভার্সিটিতে ক্লাসে যাওয়ার সময় পরা যায় রিলাক্সে। আমি টিচিং এসিসটেন্ট। আমাদের জন্য ক্লাসে টি শার্ট নট রিকমডেন্ড। যদিও সব জায়গায় সেইম নিয়ম নয়। ভালো কোনো ব্রান্ডের আনা উচিত।
৮. বানানো শার্ট ( ২ টা): পরার অভ্যাস থাকলে আনতে পারেন। টেকসই বেশি তুলনামূলকভাবে।
৯. জিন্স ( ২/৩ টা): সবচেয়ে বেশি পরা হয় জিন্স। ইউএসতেও যদিও ৩০ ডলারে ভালো জিনস পাবেন, তবে দেশ থেকে আনাটা ভালো। আবার দেশ থেকে ৪০০০ টাকায় প্রতি জিনস কেনার থেকে ইউএস থেকে কেনা ভালো। আমি নিউমার্কেট থেকে কিনছিলাম ৩০০ করে 😀
১০. গাবার্ডিন (২ টা) : এটাও আনতে পারেন। বেশ কাজে লাগে।
১১. বানানো ফরমাল প্যান্ট ( ১ টা): আনতে পারেন। বিভিন্ন প্রোগ্রামে যদি একটু ভাবসাব নিয়ে যান তাহলে কাজে লাগবে।
১২. স্যুট( ১ টা): ভালো দেখে এক সেট বানিয়ে আনতে পারেন। ভাবসাব নিয়ে অনেক প্রোগ্রামে যাওয়া যায়। এই ধরেন বিভিন্ন ডিনার মিনার ইত্যাদি। এমবিএ প্রোগ্রাম না হলে অন্য যে কোনো প্রেজেন্টশন আপনি টি শার্ট পরেও দিতে পারেন। কেউ কিছু বলবে না। স্যুট আনলে একজোড়া ফরমাল জুতা আনতে পারেন।
১৩. ট্রাউজার ( ২/৩টা): অন্যতম দরকারি জিনিস। অবশ্যই আনবেন। একটা দুইটা থারমাল ট্রাউজার আনতে পারেন, প্যান্টের নীচে পরার জন্য। শীতে খুব কাজে দিবে।
১৪. থ্রি কোয়ার্টার (২ টা) : পরার অভ্যাস থাকলে আনতে পারেন। এখানে এসেও কিনতে পারেন।
১৫. কেডস (১/২ জোড়া): ইউএসএ-তে সবচেয়ে বেশি পরা হবে কেডস/স্নিকারস। প্রথমে ঠিকঠাক চলার জন্য এক/দুই জোড়া নিয়ে আসতে পারেন। অদল বদল করে পরবেন। এরপর সুযোগ বুঝে কিনে ফেলবেন।
১৬. স্যান্ডেল/ পঞ্চ: ওয়াশরুমের জন্য একজোড়া আনতে পারেন। সেই সাথে টুকটাক বাইরে যাবেন, তখন সবসময় কেডস না পরে মাঝে মধ্যে স্যান্ডেলও পরে যেতে পারেন। এইসময় কাজে লাগবে।
১৭. হেডফোন : এইখানে সব ওয়্যারলেস হেডফোন চলে। আনলে ওয়্যারলেস আনা যায়। আবার এখান থেকেও কেনা যায়।
১৮. সুই-সুঁতা- সুই সুতা, আনা উচিত। টুকটাক কাজে লাগে।
১৯. ওষুধ- প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র আনা উচিত। ইউএসএ তে ওষুধ বা চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল। সেক্ষেত্রে কিছু ওষুধ যেমন জ্বর, সর্দি, মাথাব্যথা, ফুড পয়জনিং, কাঁটা ছেড়া, ইত্যাদির প্রাথমিক ওষুধ রুমে থাকলে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়।
২০. তুলার বালিস- আনা উচিত। এখানের বালিসে তেমন আরাম পাই না আমি। আপনার কমফোর্ট জোনের উপর নির্ভর করে সব।
২১. জায়নামাজ-টুপি: মুসলিম হলে আনা উচিত।
২২. বদনা- এটা যে কতো উপকারী যে আনে না একমাত্র সেইই বুঝে। অবশ্যই আনা উচিত বলে আমি মনে করি। ইউএসএ এর ওয়াশরুম গুলাতে হ্যান্ড স্প্রে থাকে না, কারণ এখানকার যারা বাসিন্দা তারা সাধারণত টিস্যু ব্যবহার করেন। সেক্ষেত্রে আপনি একটা বদনা আনলে কমফোর্ট জোনে থাকবেন।
২৩. বেড শীট ও বালিস কভার- আনলেও চলে, এখানে কিনতেও পাওয়া যায়। তবে দেশের ফিলটা অন্যরকম।
২৪. খাবার প্লেট- এখানে কিনতে পারা যায়। তবে বাসার ফিল পেতে বাড়ি থেকেই একটা আনছি আমি । ঐটাতেই খাই আমি।
২৫. ডাল ঘুঁটনি- এটা আনা উচিত। এখানে পাওয়া যায় না তেমন। তবে এশিয়ান/ইন্ডিয়ান শপে পাওয়া যাবে।
২৬. বেল্ট- আনা উচিত।
২৭.ব্রাশ পেস্ট- প্রাথমিকভাবে সামাল দিতে আনা উচিত।
২৮. নেইল কাটার- ভালো দেখে একটা আনা উচিত।
২৯. সানগ্লাস- এখানে দাম প্রচুর। ব্যবহারের উপর নির্ভর করে দুই তিনটা আনতে পারেন।
৩০. চিরুণী- এটা একটা আনতে পারেন।
৩১. চাবির রিং- একটা আনতে পারেন।
৩২. ঝাড়ু (১)- বিছানার ঝাড়ু, বেশ প্রয়োজনীয়।
৩৩. স্যান্ডু গেঞ্জি (৩/৪)- পরার অভ্যাস থাকলে আনা যায়
৩৪. আন্ডারওয়্যার – প্রয়োজন অনুসারে।
৩৫. গামছা/তোয়ালে (১/২)- অবশ্যই।
৩৬. সোয়েটার- হালকা শীত কাভার দেয়ার জন্য। এখানে এসে আলটিমেটলি কেনা লাগবে। তবে দেশে ভারী থাকলে নিয়ে আসতে পারেন।
৩৭. শীতের হাতমোজা ও টুপি- শীতের সময় আসলে সাথে করেই আনা উচিত। ওলের হাতমোজা না অবশ্যই। এর থেকে আলটিমেটলি বেটার বাইরে এসে কেনা।
৩৮. পাওয়ার কনভার্টার -দেশের কোনো ডিভাইস থাকলে চার্জ দেয়ার জন্য আনা উচিত। দারাজে পাওয়া যায়
৩৯. শ্যাম্পু, লোশন-প্রথমে কয়েকদিন চলার জন্য আনলে খারাপ না
৪০. মাথার ক্যাপ (১/২ টা।) বিশেষ করে টেক্সাসের মতো রোদযুক্ত এলাকায় থাকলে
৪১. জাতীয় পতাকা – অন্তত একটা
৪২. বাসার সবার বাঁধাই করা ছবি আনা উচিত। অবশ্য এখানে এসেও আপনি মোটামুটি কম টাকায় এলবাম বাঁধাই করতে পারবেন।
৪৩. নোট বুক- একটা আনা যায়। আবার এখানে এসেও কেনা যায়। অবশ্য এখানে সব রুলার করা থাকে
৪৪. কলম, পেন্সিল, স্ট্যাপলার, রুলার, রাবার ইত্যাদি- বেশি না আনলেই ভালো। প্রচুর ফ্রি পাওয়া যায় এখানে এসে।
৪৫. কুরআন শরীফ- মুসলিম হলে আনা উচিত।
৪৬. ফুলহাতা গেঞ্জি (১)- একটা আনলে হালকা শীতে রুমে পরা যায়
৪৭. ক্যালকুলেটর (১)- প্রয়োজন হলে একটা আনতে পারেন। এখানে এসেও কিনতে পারেন।
৪৮- কটনবাড়-আনা উচিত। কাজে লাগে মাঝে মধ্যে
৪৯. কার্ড হোল্ডার (১)- আনা উচিত
৫০. মানিব্যাগ (১)- আনা উচিত
তবে সবশেষ কথা: উপরের তালিকা শুধুমাত্র ধারণা দেয়ার জন্য। সব দেশের বাইরেই পাওয়া যায়, দাম কম বা বেশি। এর বাইরে কিছু না। ।
এরবাইরে অনেক জিনিস বাদ পড়তে পারে। জানাবেন। Mahedikabir1@gmail.com এ

Leave a Reply